প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
নারায়ণগঞ্জে তৈরি বিয়ের গাউন যাচ্ছে ৩৭ দেশে, রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা
||
নারায়ণগঞ্জ থেকে ৩৭ দেশে বাংলাদেশের ব্রাইডাল ড্রেস, বাড়ছে রপ্তানি ও বিনিয়োগনারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) থেকে তৈরি হচ্ছে উচ্চমূল্যের বিয়ের পোশাক। বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিপুণ হাতে তৈরি এসব ব্রাইডাল গাউন, ভেইল, স্যুট, জ্যাকেট, বোলেরো, গয়না ও নানা ধরনের আনুষঙ্গিক সামগ্রী এখন পৌঁছে যাচ্ছে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রায় ৩৭টি দেশের বাজারে।জার্মান বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে আদমজী ইপিজেডে বিশেষায়িত বিয়ের পোশাক উৎপাদন করছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করলেও এরই মধ্যে উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।বর্তমানে কারখানাটিতে কাজ করছেন ৩৫৭ জন কর্মী। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৫ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। চলতি অর্থবছরে রপ্তানি ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।জার্মানি হয়ে ৩৭ দেশে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’বাংলাদেশে তৈরি ব্রাইডাল পোশাকগুলো প্রথমে জার্মানিতে পাঠানো হয়। সেখানকার সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব পণ্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের প্রায় ৩৭টি দেশে পৌঁছে যায়। পুরো প্রক্রিয়ায় পণ্যগুলোর গায়ে বহাল থাকে বাংলাদেশের উৎপাদনের পরিচয়—‘মেইড ইন বাংলাদেশ’।বিদেশের বাজারে এসব বিয়ের পোশাকের দাম সাধারণত ৪০০ থেকে ৫০০ মার্কিন ডলারের মধ্যে। বিশেষ কিছু পোশাকের মূল্য ১ হাজার ডলার পর্যন্তও হতে পারে।ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার মো. রবিউল হক সিদ্দিকী জানান, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরুর সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দক্ষ জনবল তৈরি করা।তার ভাষ্য, বিশেষায়িত ব্রাইডাল পোশাক তৈরিতে অভিজ্ঞ কর্মী ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের লোকবল দেশে সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কর্মী ও ম্যানেজারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে হয়েছে।নিখুঁত কারুকাজে তৈরি হয় একটি গাউনসাধারণ পোশাকের তুলনায় একটি ব্রাইডাল গাউন তৈরির প্রক্রিয়া অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও সময়সাপেক্ষ। ডিজাইন অনুযায়ী গাউনের বডিস, করসেট, স্কার্ট ও ট্রেনসহ বিভিন্ন অংশ আলাদাভাবে প্রস্তুত করা হয়। এরপর এসব অংশে সূক্ষ্ম লেস, ফুল, অলংকার ও বিভিন্ন ধরনের কারুকাজ যুক্ত করে একত্র করা হয়।কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, কেউ মেশিনে কাপড় সেলাই করছেন, কেউ লেস ও অলংকার বসানোর কাজে ব্যস্ত। আবার কেউ তৈরি পোশাকের মান পরীক্ষা করছেন, কেউ রপ্তানির জন্য প্যাকেটজাত করছেন। প্রতিটি ধাপে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে।পাঁচতলা ভবনের এই কারখানায় শুরুতে ছিল মাত্র একটি প্রোডাকশন লাইন। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আটটিতে। ভবিষ্যতে উৎপাদন লাইন ১০ থেকে ১৩টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি লাইনে প্রায় ২৩ জন করে অপারেটর কাজ করবেন।আরও ৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনাবিশ্ববাজারে বিয়ের পোশাকের চাহিদা বাড়তে থাকায় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আগামী দুই বছরে বাংলাদেশে আরও ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে ইউবিএফ ব্রাইডালের।কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ব্রাইডাল পোশাকে ব্যবহৃত কাপড় সাধারণ পোশাকের তুলনায় অনেক বেশি নরম ও সংবেদনশীল। লাইনিং, অর্গানজা ও অন্যান্য সূক্ষ্ম কাপড় ব্যবহারের কারণে সামান্য অসতর্কতাতেও পোশাকের মান নষ্ট হতে পারে।এ কারণে নতুন কর্মীদের সরাসরি উৎপাদন লাইনে যুক্ত করা হয় না। আগে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সাধারণত প্রায় তিন মাস প্রশিক্ষণ শেষে একজন নতুন কর্মীকে উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়।প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা, বেড়েছে আয়কারখানাটিতে প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করছেন খাদিজা বেগম। তিনি লেস ফিটিংয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। এই কাজে যোগ দেওয়ার আগে প্রায় পাঁচ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। চাকরির শুরুতে তার মাসিক বেতন ছিল ১০ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ৩০০ টাকা।চাঁদপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে এসে কাজ করছেন শিখা আক্তার। উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর তিনি ইউবিএফ ব্রাইডালে চাকরি নেন। বর্তমানে তিনি পোশাকের গুণগত মান যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করছেন।শিখার ভাষ্য, কারখানার কর্মপরিবেশ ভালো এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।পোল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে আসছে উৎপাদনইউবিএফ ব্রাইডালের পোল্যান্ডেও একটি কারখানা রয়েছে। সেখানে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কিছু পণ্য বাংলাদেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।ইতোমধ্যে পোল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষকরা বাংলাদেশে এসে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে।শুধু বিদেশি ডিজাইনারদের নকশায় পোশাক তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্থানীয় ডিজাইনারদের নকশায় ব্রাইডাল পোশাক তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।পাশাপাশি দেশে এমব্রয়ডারি ও লেস উৎপাদন বাড়িয়ে স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশেই ব্রাইডাল পোশাকের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য জুতা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।বিশ্ববাজারে দ্রুত বাড়ছে ব্রাইডাল পোশাকের চাহিদাগ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বিয়ের পোশাকের বাজারের আকার ছিল ৮২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে বাজারটি ১০৯ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধি, বিলাসবহুল পোশাকের প্রতি আগ্রহ এবং কাস্টমাইজড বিয়ের পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারে বার্ষিক গড় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।এই ক্রমবর্ধমান বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ তৈরি পোশাক খাতের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছে।আদমজী ইপিজেডে বাড়ছে রপ্তানিমুখী শিল্পঐতিহাসিক আদমজী জুট মিল বন্ধ হওয়ার পর বিশাল শিল্পভূমিকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে ওই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় আদমজী ইপিজেড।নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত এই ইপিজেডের আয়তন প্রায় ২৯২ দশমিক ৬২ একর। গত দুই দশকে এখানে তৈরি হয়েছে বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা। এর মধ্যে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আদমজী ইপিজেডে কর্মরত রয়েছেন ৭৬ হাজার ২৭ জন। এখানে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ এসেছে ৮৪৭ দশমিক ০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।ইপিজেডটির বিভিন্ন কারখানা থেকে এ পর্যন্ত মোট ১১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, মাইকেল কর্স ও ভ্যান হিউসেনের মতো ব্র্যান্ডের জন্যও এখানকার কারখানাগুলো উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করছে।বিশ্ববাজারে বিশেষায়িত ও তুলনামূলক বেশি দামের পোশাকের চাহিদা বাড়ার এই সময়ে আদমজী ইপিজেডে ব্রাইডাল ড্রেস উৎপাদনের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিশ্ববাজারে উচ্চমূল্যের ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের উপস্থিতিও আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বি পি নিউজ