প্রিন্ট এর তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যে ‘এক-এগারো’ প্রসঙ্গ, সুযোগ নেওয়ার আলোচনায় আওয়ামী লীগ
||
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাবনা ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ২০০৭ সালের ‘এক-এগারো’ পরিস্থিতি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে কথিত ‘ডিপ স্টেট’ বা পর্দার আড়ালের কোনো শক্তির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও নানা বক্তব্য।সম্প্রতি এক প্রবাসী সাংবাদিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে কথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ওই বক্তব্যের পক্ষে স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে এসেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। ফলে বিষয়টি বর্তমানে মূলত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও জল্পনার পর্যায়েই রয়েছে।২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সে সময় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাত ও অনিশ্চয়তার মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং সেনাবাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। পরবর্তী সময়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ‘মাইনাস টু’ ধারণা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ২০০৭ সালের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত, পারস্পরিক অনাস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিরোধ দীর্ঘায়িত হলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করার দাবিও সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংস্কার ও রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে।বিশেষ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে এনসিপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিরোধ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এনসিপির নেতারা সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রমের সমালোচনা করেছেন। দলটির পক্ষ থেকে সাইবার আইন, গুমবিরোধী আইন এবং বিশেষ রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ কয়েকটি বিষয় নিয়েও আপত্তি জানানো হয়েছে।অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে কর্মসূচি পালন করছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক সংস্কার এবং আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রত্যাশা পূরণের বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।এই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশীদার হয়ে ওঠা দলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, রাজনৈতিক বিরোধ যদি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।এমন প্রেক্ষাপটেই ‘তৃতীয় শক্তি’ কিংবা কথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট শক্তি সমন্বিতভাবে এমন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে কি না, কিংবা কোনো রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সক্রিয় রয়েছে কি না—এমন দাবির পক্ষে প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না থাকায় নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অবস্থানও। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকার মধ্যে তাদের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন তৎপরতা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দলটির সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষণে সাধারণভাবে উঠে আসছে, বিরোধী দলগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সংসদীয় কার্যক্রম, সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাজনৈতিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৭ সালের অভিজ্ঞতা থাকায় বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘এক-এগারো’র প্রসঙ্গ ফিরে আসা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্যও রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করাই বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার প্রধান ভিত্তি।বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—দলগুলোর মতপার্থক্য কতটা রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা যায় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ও জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা যায়। এসব বিষয়ই আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিবেশ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: আরিফুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত বি পি নিউজ